১। কাহিনী সংক্ষেপঃ
কবিরাজি পেশা জীবন দত্তদের তিনপুরুষের পেশা। দাদা দিনবন্ধু মশায় নাড়ি দেখে রোগের চিকিৎসা করতেন। পিতা জগদ্বন্ধু মশায় প্রতিষ্ঠা করেন আরোগ্য-নিকেতন। জীবনমশায় এর পুত্র ছিলেন পাশ করা ডাক্তার। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মশায় পরিবার চিকিৎসাবিদ্যায় নিজেদেরকে এগিয়ে নিয়েছিল। জীবন মশায় কবিরাজির সাথে ডাক্তারি ও জানতেন। আর একটা জিনিস জানতেন। রোগীর হাত দেখে তার মৃত্যুর সময় বলে দিতে পারতেন। যাকে গ্রামবাসীরা নিদান হাঁকা বলতো।
তরুন ডাক্তার প্রদ্যোত মিত্র নিদান হাঁকাকে কুসংস্কার অনেকক্ষেত্রে অমানবিক বলে মনে করতো। সে মতির মায়ের নিদান উলটে দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তুলে। তার চোখে জীবন মশায়ের মতো লোকেরা হাতুড়ে ডাক্তার। কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসীদেরকে এইসব লোকেদের কাছে চিকিৎসা নিতে বারণ করে।
প্রবীণ জীবন মশায় নিজের অক্ষমতা মেনে তার কাছে আসা রোগীদেরকে প্রদ্যোত ডাক্তারের কাছে আধুনিক চিকিৎসা নিতে বলতেন।
২।
দ্বিতীয় শতাব্দীতে পশ্চিমা বিশ্বে একজন প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসাবিদ ছিলেন। তাঁর নাম ছিল গ্যালেন। গ্রীসে জন্ম হলেও গ্যালেনের কর্মভূমি ছিল রোম। টানা কয়েক দশক ধরে রোমান সম্রাটদের গৃহ চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। প্রাচীন গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং নিজের গবেষণার ফলাফল মিলিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন অসামান্য কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি। তখন রোমে মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ করা নিষিদ্ধ থাকায় গ্যালেন শূকর বা অন্যান্য প্রাণী ব্যবচ্ছেদ করে গবেষণার কাজ করতেন। তাঁর কাজগুলি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সেগুলোকে আলাদা করে বলা হত গ্যালেনিজম। সবই যে তাঁর মৌলিক আবিষ্কার ছিল তা নয়। বহু প্রাচীন চিকিৎসকের তত্ত্ব, যেগুলি তিনি সঠিক বলে মনে করেছিলেন তা গ্রহণ করেছিলেন। গ্যালেনিজমের মূল তত্ত্বগুলির অন্যতম ছিল রোগীর পালস বা নাড়ীর স্পন্দন সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
ভারতবর্ষের মতো দেশে আয়ুর্বেদ হল পঞ্চম বেদ। প্রাচীনকাল থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী বায়ু-পিত্ত-কফ আর তার খুঁটিনাটির বিদ্যা প্রয়োগ করে মানবদেহের রোগনির্ণয় আর তার প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করে এসেছেন একদল চিকিৎসক। দেখিয়েছেন রোগমুক্তির পথ। সেই সব ভিষগাচার্যরা রোগীর মণিবন্ধে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে অনুভব করতেন নাড়ীর গতি আর ছন্দ। সেই থেকে রোগ নির্ণয় করতেন। এই কাজে আয়ুর্বেদের জ্ঞানের সঙ্গে প্রয়োজন হতো অধ্যাবসায় ও প্রখর অনুভবশক্তি। নাড়ীর গতি প্রকৃতি অনুভব করে তাঁরা রোগের সময়কাল বলে দিতে পারতেন। কখন রোগের প্রকোপ বাড়বে, কখন কমবে, কখন ব্যাধি এসেছে কালরূপে অর্থাৎ মৃত্যুর দূত হয়ে, কখন আবার কঠিন রোগেও রোগী লড়াই করে জিতে যাবে এ সবই নাকি তাঁরা নাড়ী ধরে বুঝতে পারতেন। সেই মতো তাঁরা ওষুধ ও পথ্য দিতেন। গ্রাম বাংলায় এইসব ভিষগাচার্যরাই ছিলেন মানুষের জীবন মরণের ভরসা।
ইউরোপে রেনেসাঁ আগমনের আগে পর্যন্ত গ্যালেনের তত্ত্বই ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি। ত্রয়োদশ শতকে ইবনুন আল নাফিস নামের একজন আরবি চিকিৎসাবিদ পালমোনারি সারকুলেশন আবিষ্কার করে প্রথম গ্যালেনের চিকিৎসা পদ্ধতির উপর প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর প্রায় দুশো বছর পর স্যার উইলিয়াম হার্ভে (১৫৭৮-১৬৫৭) আবিষ্কার করেছিলেন শরীরে রক্ত সঞ্চালনের সঠিক গতিপথ। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, নাড়ীর স্পন্দনের উৎস নাড়ী নয়, হৃৎপিণ্ডের বাম নিলয়। সপ্তদশ শতকে গ্যালিলিওর পেন্ডুলাম আবিষ্কারের পর স্যান্টারিও স্যান্টারিয়াম (১৫৬১-১৬৩৬) আবিষ্কার করলেন পালসোলজি। এরও প্রায় একশ বছর পরে জন ফ্লয়ার (১৬৪৯-১৭৩৪) আবিষ্কার করলেন পালস ওয়াচ। প্রতি মিনিটে নাড়ীর স্পন্দন নির্ভুলভাবে গণনা করা সম্ভব হল। এরপর উনিশ শতকে বিশ্বজুড়ে নাড়ীর স্পন্দন সংক্রান্ত গবেষণা দ্রুতগামী রথে চেপে অনেকগুলি মাইলফলক পেরিয়ে গেল। আবিষ্কার হল স্ফিগমোমিটার, টাইমোগ্রাফ, স্ফিগমোগ্রাফ এবং পালস ওয়েভ ভেলোসিটির তত্ত্ব। নাড়ীর স্পন্দন গণনা হয়ে উঠল সূক্ষ্ম যন্ত্র নির্ভর এবং পুরোপুরিভাবে বিজ্ঞানসম্মত।
‘আরোগ্য-নিকেতনে’র অজস্র চরিত্রের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় লেখক নিজেই প্রকাশ করে দিয়েছেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর তারাশঙ্কর ব্যোমকেশ মজুমদারকে চিঠিতে লিখেছিলেন,
“জীবনমশায় ছিলেন। তাঁকে দেখেছি, তাঁর ওষুধ খেয়েছি। এবং যে সব রোগী ও রোগের কথা লিখেছি তার পনের আনাই সত্য। কৃষ্ণদাসবাবুর যে ছেলেটির টাইফয়েড হয়েছিল- যাতে রঙলাল ডাক্তার এসেছিলেন- কিশোর যার নাম- তাঁর বাল্য বয়সটাই আমি। ... রঙলাল ডাক্তার সত্যকারের মানুষ। তিনি সাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ সহোদর।”১
তথ্যসূত্র ঃ
১। ‘আরোগ্য-নিকেতন’ ও কয়েকজন চিকিৎসক : আমার চোখে তারাশঙ্করের গল্পভুবন : নীতা মণ্ডল
Comments
Post a Comment