Skip to main content

ডমরু-চরিত (১৯২৩) - ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়


ডমরু-চরিতে একজন মহাকৃপণ, ধূর্ত, অর্থলোভী, সুযোগ-সন্ধানী এবং তৎসহ প্রবঞ্চক অথচ বুদ্ধিমান, সাহসী, কার্যপটু ব্যক্তির চোখ দিয়ে জগৎ-দর্শন করিয়েছেন গ্রন্থকার। ডমরুধর শঠ, প্রবঞ্চক, ফন্দিবাজ - এক কথায় একটি ডার্ক ক্যারেক্টার। ব্যঙ্গের সঙ্গে উদ্ভট রসের আশ্চর্য মিশ্রণেই এই বইয়ের আসল মজা। আসলে যুগটাই ছিল ব্যঙ্গ রচনার অনুকূল। সবসময় সবরকম যুগ পরিবেশে ব্যঙ্গ সাহিত্যের উদ্ভব হয় না। একধরনের সংশয়বোধ, মানসিক দ্বিধা, চিন্তার দোদুল্যমানতা ব্যঙ্গ সাহিত্যের জন্ম দিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে শিশিরকুমার দাস বলেছেনঃ

সমাজে যখন ভাঙন আরম্ভ হয়, যখন স্থির অবিচলিত সত্যগুলি পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে তখনই ব্যঙ্গের সূচনা।

লেখক খুব সাধারণ, হাস্যরসাত্মক চালে গল্পগুলো বলা শুরু করেন, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ গল্পের ভেতরে এমন এক গভীর সামাজিক সত্য বা মানব চরিত্রের স্বার্থপরতার রূপ উন্মোচন করেন, যা পাঠককে একাধারে হাসায় এবং ভাবিয়ে তোলে। বইটিতে অন্যায়কারীর বয়ানে ঘটনাগুলোকে দেখানো হয়েছে। অপরাধী মনে করে সে যথেষ্ট উচিত কাজ করছে, তার দোষ ধরা কোনোভাবেই উচিত নয়। যার ফলে পাঠকের কাছে চরিত্রটির অসাড়তা ও মানবসমাজের স্বার্থপরতার রূপটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরা পড়েছে বইটিতে। সূচনা থেকেই পাঠক আঁচ পেয়ে যান ডমরুধর লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়, কিন্তু আশ্চর্য হতে হয় যখন শ্রোতাদের কাছে নিজের জোচ্চুরি, প্রতারণার ইতিহাস নিঃসঙ্কোচে বলে চলেন তিনি; এবং মুখে তাঁর বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের অভিব্যক্তি ফোটে না, চোখ নীচু হয় না, গলা খাটো হয়ে আসে না অনুতাপে। মোহর চুরির কথা, দোকানে বসে লোক ঠকানোর কথা, স্বদেশি কোম্পানি খুলে গরিব মানুষের টাকা গাপ করবার কথা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় বর্ণনা করে ডমরু।

দ্বিতীয় গল্পে মোহর চুরি করার অপরাধে ডমরুর শ্বশুর প্রসাদ সেন মহা বিরূপ হয়ে তার ঘরে আর কন্যা পাঠাবেন না ঠিক করেন। কিন্তু মানবস্বভাব ডমরুর খুব ভালোভাবেই জানা ছিল।

যেমন করিয়া পারি, আমি ধনবান হইব, টাকা হইলে কেহ তখন জিজ্ঞাসা করে না যে, অমুক কি করিয়া সম্পত্তিশালী হইয়াছে। জাল করিয়া হউক, চুরি করিয়া হউক, যেমন করিয়া লোক বড় মানুষ হউক না কেন, অমুকের টাকা আছে, এই কথা শুনিলেই ইতর-ভদ্র সকলেই গিয়া তাহার পদলেহন করে, সকলেই তাহার পায়ে তৈলমর্দন করে, একবার আমার টাকা হউক, তখন দেখিব যে, তুমি বাছাধন আমার বাড়িতে ফ্যাঁন চ্যাটিতে যাও কিনা।

ডমরু শেখাচ্ছে কীভাবে ব্যবসায় সাফল্যলাভ করতে হয় - দোকানে যে খদ্দের দাম নিয়ে হেঁচড়া-হেঁচড়ি কচলাকচলি করতেন না, তাঁকে দোকানদারের নির্দেশে বিলক্ষণ ঠকানো হতো।

দোকানদারের রীতি এই। আলাপী লোকেরা আমাদিগকে বিশ্বাস করে, আলাপী লোককে ঠকাইতে দোকানদারের বিলক্ষণ সুবিধা হয়। বড়বাজারে বসিয়া প্রতিদিন হাজার হাজার মিথ্যা কথা বলিতাম; শত শত লোককে আমরা ঠকাইতাম। না ঠকাইলে আমাদের কাজ চলে না।

ডমরুর প্রথম গল্পে 'হুজুগপ্রিয়' বাঙালিকে লেখক একহাত নিয়েছেন। ডমরু একটি সন্ন্যাসীকে পালন পোষণে কিঞ্চিৎ লাভের মুখ দেখছিল। প্রণামী হিসেবে লোকেরা যা দিত তার অর্ধেক চুক্তি অনুযায়ী সে পাচ্ছিল। ডমরুর ভাষ্যমতে -

যাহাতে তাহার প্রসার প্রতিপত্তি আরও বৃদ্ধি হয়, দেশের যত উজবুক যাহাতে তাহার গোঁড়া হয়, সেজন্য আমি চেষ্টা করিতে লাগিলাম। মনে মনে সঙ্কল্প করলাম যে, দুগ্ধবতী গাভীর ন্যায় সন্ন্যাসীটিকে আমি পুষিয়া রাখিব। কিন্তু একটা হুজুক লইয়া বাঙালী অধিক দিন থাকিতে পারে না। হুজুক একটু পুরাতন হইলেই বাঙালী পুনরায় নূতন হুজুকের সৃষ্টি করে। অথবা এই বঙ্গভূমির মাটির গুণে আপনা হইতেই নূতন হুজুকের উৎপত্তি হয়। ... পাঁছগেছে গ্রামে রসিক মণ্ডলের সপ্তমবর্ষীয়া কন্যার স্কন্ধে মাঁকাল ঠাকুর অধিষ্ঠান হইলেন। রসিক মণ্ডল জাতিতে পোঁদ। মাঁকালঠাকুরের ভরে সেই কন্যা লোককে ঔষুধ দিতে লাগিল। দেবদত্ত ঔষুধের গুণে অন্ধের চক্ষু, বধিরের কর্ণ, পঙ্গুর পা হইতে লাগিল। বোবার কথা ফুটিতে লাগিল। কতগুলি সুস্থ লোককে কানা, খোঁড়া, হাবা, কালা, জোড়ো, অম্বুলে সাজাইতে হয়, তা না করিলে এ কাজে প্রসার হয় না।

তৃতীয় গল্পে স্বদেশি কোম্পানি প্রসঙ্গে বাঙালির ব্যবসা বুদ্ধি এবং চরিত্র সম্বন্ধে আবারও কটাক্ষপাত করেছে ডমরুধর। দেবী দশভূজা নাকি তাকে স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে বর প্রার্থনা করতে বলেছিলেন। ডমরুর ইচ্ছে ছিল সুন্দরবনে তার আবাদে মৃগনাভি হরিণের চাষের জন্য স্বদেশি কোম্পানি খোলে। ভেড়ার পালের মতো বাংলার লোক যেন টাকা দেয়... এই বর সে প্রার্থনা করেছিল। দেবীর মনে যথেষ্ট সংশয় ছিল, তুষারাবৃত হিমাচলে কস্তুরী হরিণ বাস করে, সুন্দরবনে তার চাষ হবে কী করে। ডমরু কিন্তু নির্ভয়।

যে কাজ সম্ভব, যে কাজে লাভ হইতে পারে, সে কাজে বাঙালী বড্ড হস্তক্ষেপ করে না। অদ্ভুত বিষয়েই বাঙালী টাকা প্রদান করে।

নিতান্ত অল্প বয়স থেকে জীবনসংগ্রামে নামতে হয়েছিল ত্রৈলোক্যনাথকে। বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের শয়তানি ও স্বার্থপরতার নানা রূপ দেখেছেন। ষষ্ঠ গল্পে আমরা এর নমুনা দেখতে পাই।

ভিলে বলিল,—তবে দিদি কি হবে, ভাত না খাইয়া আর আমি থাকিতে পারি না। আজ সমস্ত দিন কিছু খাই নাই, আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে। ক্ষুধায় আমার পেট জ্বলিয়া যাইতেছে।

মেনী বলিল,—আর বৎসর ভড়েদের বাড়ী তুমি দুর্গা ঠাকুর দেখিয়াছিলে। সেই দশ হাত আর কত রাঙতা? ভড়েরা তোমাকে মুড়কি ও নারিকেল নাড়ু দিয়াছিল? পূজা হইয়া গেলে বোসেদের গঙ্গায় তাহারা ঠাকুর বিসর্জ্জন করিয়াছিল, মা দুর্গা বোসেদের গঙ্গার ভিতর আছেন। কাল যদি তোমাকে দুইটী ভাত দিতে না পারি, তাহা হইলে আমরা দুইজনে বোসেদের গঙ্গায় যাইব। তোমাকে কোলে লইয়া আমি জলে ঝাঁপ দিব; জলের ভিতর মা দুর্গা আছেন; তাঁহার কাছে আমরা যাইব। তিনি আমাদিগকে অনেক ভাত দিবেন, আমদের সকল দুঃখ ঘুচাইবেন।

মেনী গোয়ালা-ছুঁড়ির ঘর ঠিক আমার বাগানের পাশে। ঐ স্থানটাতে আমার বাগানে একটু খোঁচ হইয়া আছে। মেনী ও তাহার ভাই মরিয়া গেলে ঐ ভূমিটুকু আমি লইব। তাহা হইলে আমার বাগানের খোঁচটী ঘুচিয়া যাইবে। তাহারা সত্য সত্যই বোসেদের গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়া মরিবে কি না, তাহা জানিবার নিমিত্ত পরদিন প্রাতঃকালে বেলা দশটার সময় আমি ঘর হইতে বাহির হইলাম।

এহেন ডমরুধর নিজেকে দেবী দুর্গার বরপুত্র বলে। সমস্ত সংকটে দেবীই তাঁর ত্রাতা এবং যত লোক-ঠকানো কুবুদ্ধি নাকি দেবীর কৃপাতেই তাঁর মাথায় গজিয়ে ওঠে। দেবী নিজে এসে দেখাও করেন তার সঙ্গে! ডমরু নিজেকে স্বয়ং কার্তিকের অবতার বলতেও ছাড়েনি। যুগে যুগে সমাজের ডমরুধরেরা নির্লজ্জের মতো নিজের অন্যায়, অনুচিত কাজগুলিকে মা দুর্গার দোহাই দিয়ে শুদ্ধ ও পবিত্র প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় বিন্দুমাত্র সংকোচ করেনা।




Comments

Popular posts from this blog

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

 ল্যাপ্লাসকে যখন প্রশ্ন করা হতো জার্মানির সেরা গণিতবিদ কে ? , তার একটাই উত্তর ছিলো, ফ্যাফ(pfaff)। গাউস কে বাদ দিয়ে ফ্যাফ এর নাম শুনতে হবে এটা কোনো প্রশ্নকর্তা ই আশা করতেন না।  তারা যখন তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতেন, তাহলে গাউস কী ?  ল্যাপ্লাসের উত্তর ছিলো, আরে ও তো ইউরোপের সেরা।   মর্ডান অ্যানালাইসিস এ সেরা তিনজনের ( ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,গাউস) একজন হলেন গাউস । গাউস ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট । তবে, গাউস এর কাজের মাধ্যমেই গণিতের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।  নতুন আবিস্কারের নেশা এবং সক্ষমতায় তিনি তার পূর্ববর্তী গণিতবিদদেরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাণ এবং যথাযথ উপস্থাপনে একমাত্র গ্রিকদের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে ।  মাত্র বিশ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের পুরানো সব তত্ত্বকে  নতুন করে ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন প্রমাণ পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।  উপস্থাপনের সাবলীলতায় তিনি ল্যাপ্লাস এবং ল্যাগ্রাঞ্জকে ও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ইনফিনিট সিরিজ(পূর্ণাঙ্গরুপে), ইলিপটিক ফাংশন এর ডাবল পিরিওডিসিটি,লিস্ট স্কয়ার মেথড, ডিটারমিনেন্ট এর সিস্টেমেটিক ব্যবহার...

ফিল্ডস মেডাল

 MIT এর জেনিটর উইল হান্টিং এর কথা মনে আছে । যে গণিত বিভাগের  নোটিশ বোর্ডে ঝুলিয়ে রাখা কঠিন কঠিন গাণিতিক সমস্যা গুলোর সমাধান লুকিয়ে লুকিয়ে  করে দিয়ে যেতো । আর, প্রফেসর জেরাল্ড খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন কে এই জিনিয়াস । 'গুড উইল হান্টিং' সিনেমায় প্রফেসর জেরাল্ড  "ফিল্ডস মেডাল " জয় করেন। যদিও সিনেমায় তার বয়স কোনক্রমেই চল্লিশের কম মনে হয়নি ।  গণিতে অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ এবং ভবিষ্যতে গবেষককে গবেষণা কাজে আরও উৎসাহিত করতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয় । চার বছর পর পর  পুরস্কার প্রদান করা হয় । একবারে কমপক্ষে দুইজন এবং  সর্বোচ্চ চারজনকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। যে বছর পুরস্কার দেয়া হবে ঐ বছরের জানুয়ারির ১ তারিখে বয়স অনধিক চল্লিশ হতে হবে।  পুরস্কারের অর্থমূল্য ১৫০০০ কানাডিয়ান ডলার।  এর সাথে  ৫,৫০০ কানাডিয়ান ডলার মূল্যের একটি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় ।  প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর IMU এর কংগ্রেসের শুরুর দিনে ফিল্ডস মেডাল প্রদান করা হয়।  গণিতবিদ জে সি ফিল্ডস এর নাম অনুসারে একে ফিল্ডস মেডাল বলা হলেও, এর অফিসিয়াল নাম, "International medals for outst...