Skip to main content

যকের ধন, আবার যখের ধন - হেমেন্দ্রকুমার রায়

 



সৃষ্টির একেবারে শুরুর দিকে, জগৎসংসার সচল করতে ব্রহ্মা যখন মগ্ন হয়ে সৃষ্টির কাজ করছিলেন, তখন তিনি এক অদ্ভুত প্রকৃতির জীব সৃষ্টি করলেন। এরা দেখতে যেমন দিব্য ও জ্যোতির্ময় ছিল, তেমনই এদের শক্তি ছিল প্রবল। ব্রহ্মা এদের সৃষ্টি করার পর নির্দেশ দিলেন, "তোমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জলসম্পদ, গভীর অরণ্য এবং মাটির নিচের গোপন রত্নভাণ্ডার রক্ষা করবে।"


কিন্তু সৃষ্টির পরই এই জীবদের মধ্যে প্রবল ক্ষুধা ও এক অদ্ভুত অস্থিরতা দেখা দিল। তারা ব্রহ্মার দিকে তাকিয়ে হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল। একদল বলল, "রক্ষাম!" (আমরা রক্ষা করব), আর অন্য দল বলল, "যক্ষাম!" (আমরা ভক্ষণ করব বা গ্রাস করব)। ব্রহ্মার আদেশ মেনে যারা মাটির নিচ ও প্রকৃতির সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করল এবং তীব্র আসক্তি নিয়ে তা আঁকড়ে ধরে রইল, ব্রহ্মার মুখ নিঃসৃত সেই "যক্ষাম" শব্দ থেকেই তাদের নাম হয়ে গেল "যক্ষ"


যক্ষরা সৃষ্টি হলো ঠিকই, কিন্তু তাদের কড়া শাসনে রাখার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রাজা ছিল না। 

হিমালয়ের অতীব উঁচুতে, কৈলাস পর্বতের ঠিক পাশেই অবস্থিত এক স্বর্গীয় শহর—অলকাপুরী। বিশ্বকর্মা নিজে এই শহরটি নির্মাণ করেছিলেন সোনা, হীরা আর মহামূল্যবান মণি-মুক্তা দিয়ে। অলকাপুরীর প্রতিটি প্রান্তে উড়ত সুগন্ধী বাতাস, আর সেখানকার রাজপ্রাসাদগুলো জ্বলজ্বল করত সূর্যের আলোর মতো। এই অলকাপুরীর রাজা ছিলেন কুবের জন্মসূত্রে রাক্ষসরাজ রাবণের বড় ভাই হলেও, তিনি রাক্ষসদের মতো অধর্মাচরণে লিপ্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও তপস্বী। কুবের বুঝতে পেরেছিলেন যে, ক্ষমতার চেয়ে তপস্যা ও ঈশ্বরভক্তি অনেক বড়। আত্মশুদ্ধির জন্য হিমালয়ের তীব্র শীতের মাঝে হাজার বছর ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঘোর তপস্যা শুরু করলেন। তাঁর তপস্যার তীব্রতায় ত্রিভুবন কেঁপে উঠল। কুবেরের এই নিষ্ঠা দেখে দেবদেবীরা মুগ্ধ হলেন।


অবশেষে, কুবেরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং পরমপিতা ব্রহ্মা এবং মহাদেব শিব তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। শিব কুবেরকে তাঁর পরম বন্ধু হিসেবে বুকে টেনে নিলেন। আর ব্রহ্মা কুবেরকে বললেন, "হে বিশ্রবার পুত্র, তোমার এই অসামান্য ত্যাগে আমি প্রীত হয়েছি। আজ থেকে তুমি দেবতাদের সমকক্ষ মর্যাদা লাভ করলে। তোমাকে আমি জগতের সমস্ত ধন-সম্পদ, সোনা-দানা এবং নিধি-ভাণ্ডারের পরম রক্ষক ও কোষাধ্যক্ষ ঘোষণা করছি।" একই সাথে, ব্রহ্মা পৃথিবীর সমস্ত জল, অরণ্য ও মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনের রক্ষাকারী সেই আদি শক্তিশালী যক্ষ, কিন্নর ও গুহ্যকদের পরম রাজা হিসেবে কুবেরকে অভিষিক্ত করলেন।


যকের ধন 

মড়ার খুলির উপরে লিখে রাখা ধাঁধার সমাধান করতে পারলে মিলবে রাজার ঐশ্বর্য। যার পাহারায় আছে যখেরা। এই সম্পদের লোভে বিমল-কুমারের পিছু নিয়েছে তাদেরই এক প্রতিবেশী; যে প্রয়োজনে নরহত্যা করতেও পিছপা হয়না । রত্নের খোজে আসামের ঘন জংগলে অল্পের জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলো বিমল। তবুও সে দমবার পাত্র নয়। এর শেষ দেখে ছাড়বে। 


আবার যখের ধন

এবার বিমল কুবেরের গন্তব্যস্থল মোম্বাসা, আফ্রিকা। উদ্দেশ্য সাত রাজার ধন উদ্ধার। এডভেঞ্চার এর লোভে হিংস্র জুলুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতেও প্রস্তত বিমল। ঘরের শত্রু বিভীষণ ছোটকাকা, আর ঘটোতকচ নামের এক উপদ্রব পুরোটা সময় গুপ্তধনের লোভে তাদের পিছনে লেগেই আছে। সিংহ দমন গাটুলা সর্দার তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে নরকের দরজার দিকে.........

পুনশ্চ ঃ

লোককাহিনী অনুযায়ী, কেউ যদি অতি কৃপণ হয়ে প্রচুর ধনসম্পদ জমায় এবং মরণকালে তা কাউকে না দিয়ে মাটিতে পুঁতে রেখে মারা যায়, তবে সে মৃত্যুর পর 'যক' বা 'যক্ষ' রূপে জন্ম নেয়।সেই যক নিজের পুতে রাখা ধনসম্পদের ওপর বসে থাকে এবং তীব্র আসক্তি নিয়ে তা পাহারা দেয়। কেউ সেই ধনের কাছে গেলে যক তাকে আক্রমণ করে।

তথ্যসূত্রঃ

১. যকের ধন, আবার যখের ধন - হেমেন্দ্রকুমার রায়
২. রামায়ণ (উত্তর কাণ্ড, ৪ অধ্যায় )
৩. মহাভারত (বন পর্ব) 
৪. শিব পুরাণ (রুদ্র সংহিতা, সৃষ্টি খণ্ড)



Comments

Popular posts from this blog

ডমরু-চরিত (১৯২৩) - ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়

ডমরু-চরিতে একজন মহাকৃপণ, ধূর্ত, অর্থলোভী, সুযোগ-সন্ধানী এবং তৎসহ প্রবঞ্চক অথচ বুদ্ধিমান, সাহসী, কার্যপটু ব্যক্তির চোখ দিয়ে জগৎ-দর্শন করিয়েছেন গ্রন্থকার। ডমরুধর শঠ, প্রবঞ্চক, ফন্দিবাজ - এক কথায় একটি ডার্ক ক্যারেক্টার। ব্যঙ্গের সঙ্গে উদ্ভট রসের আশ্চর্য মিশ্রণেই এই বইয়ের আসল মজা। আসলে যুগটাই ছিল ব্যঙ্গ রচনার অনুকূল। সবসময় সবরকম যুগ পরিবেশে ব্যঙ্গ সাহিত্যের উদ্ভব হয় না। একধরনের সংশয়বোধ, মানসিক দ্বিধা, চিন্তার দোদুল্যমানতা ব্যঙ্গ সাহিত্যের জন্ম দিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে শিশিরকুমার দাস বলেছেনঃ সমাজে যখন ভাঙন আরম্ভ হয়, যখন স্থির অবিচলিত সত্যগুলি পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে তখনই ব্যঙ্গের সূচনা। লেখক খুব সাধারণ, হাস্যরসাত্মক চালে গল্পগুলো বলা শুরু করেন, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ গল্পের ভেতরে এমন এক গভীর সামাজিক সত্য বা মানব চরিত্রের স্বার্থপরতার রূপ উন্মোচন করেন, যা পাঠককে একাধারে হাসায় এবং ভাবিয়ে তোলে। বইটিতে অন্যায়কারীর বয়ানে ঘটনাগুলোকে দেখানো হয়েছে। অপরাধী মনে করে সে যথেষ্ট উচিত কাজ করছে, তার দোষ ধরা কোনোভাবেই উচিত নয়। যার ফলে পাঠকের কাছে চরিত্রটির অসাড়তা ও মানবসমাজের স্বার্...

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

 ল্যাপ্লাসকে যখন প্রশ্ন করা হতো জার্মানির সেরা গণিতবিদ কে ? , তার একটাই উত্তর ছিলো, ফ্যাফ(pfaff)। গাউস কে বাদ দিয়ে ফ্যাফ এর নাম শুনতে হবে এটা কোনো প্রশ্নকর্তা ই আশা করতেন না।  তারা যখন তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতেন, তাহলে গাউস কী ?  ল্যাপ্লাসের উত্তর ছিলো, আরে ও তো ইউরোপের সেরা।   মর্ডান অ্যানালাইসিস এ সেরা তিনজনের ( ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,গাউস) একজন হলেন গাউস । গাউস ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট । তবে, গাউস এর কাজের মাধ্যমেই গণিতের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।  নতুন আবিস্কারের নেশা এবং সক্ষমতায় তিনি তার পূর্ববর্তী গণিতবিদদেরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাণ এবং যথাযথ উপস্থাপনে একমাত্র গ্রিকদের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে ।  মাত্র বিশ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের পুরানো সব তত্ত্বকে  নতুন করে ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন প্রমাণ পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।  উপস্থাপনের সাবলীলতায় তিনি ল্যাপ্লাস এবং ল্যাগ্রাঞ্জকে ও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ইনফিনিট সিরিজ(পূর্ণাঙ্গরুপে), ইলিপটিক ফাংশন এর ডাবল পিরিওডিসিটি,লিস্ট স্কয়ার মেথড, ডিটারমিনেন্ট এর সিস্টেমেটিক ব্যবহার...

ফিল্ডস মেডাল

 MIT এর জেনিটর উইল হান্টিং এর কথা মনে আছে । যে গণিত বিভাগের  নোটিশ বোর্ডে ঝুলিয়ে রাখা কঠিন কঠিন গাণিতিক সমস্যা গুলোর সমাধান লুকিয়ে লুকিয়ে  করে দিয়ে যেতো । আর, প্রফেসর জেরাল্ড খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন কে এই জিনিয়াস । 'গুড উইল হান্টিং' সিনেমায় প্রফেসর জেরাল্ড  "ফিল্ডস মেডাল " জয় করেন। যদিও সিনেমায় তার বয়স কোনক্রমেই চল্লিশের কম মনে হয়নি ।  গণিতে অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ এবং ভবিষ্যতে গবেষককে গবেষণা কাজে আরও উৎসাহিত করতে এই পুরস্কার প্রদান করা হয় । চার বছর পর পর  পুরস্কার প্রদান করা হয় । একবারে কমপক্ষে দুইজন এবং  সর্বোচ্চ চারজনকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। যে বছর পুরস্কার দেয়া হবে ঐ বছরের জানুয়ারির ১ তারিখে বয়স অনধিক চল্লিশ হতে হবে।  পুরস্কারের অর্থমূল্য ১৫০০০ কানাডিয়ান ডলার।  এর সাথে  ৫,৫০০ কানাডিয়ান ডলার মূল্যের একটি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় ।  প্রতি চার বছর অন্তর অন্তর IMU এর কংগ্রেসের শুরুর দিনে ফিল্ডস মেডাল প্রদান করা হয়।  গণিতবিদ জে সি ফিল্ডস এর নাম অনুসারে একে ফিল্ডস মেডাল বলা হলেও, এর অফিসিয়াল নাম, "International medals for outst...