গঙ্গাচরণ বললেন, “ও যেন গ্রামের লোকের চোখ ফুটিয়ে দিয়ে গেল। একটি মূর্তিমান বিপদের সংকেত স্বরূপ ওর মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে আমগাছটার তলায়। অনাহারে প্রথম মৃত্যুর অশনি-সংকেত।”
অনাহারের আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের বিনাশের অশনি সংকেত। নিস্তেজ নিস্তরঙ্গ ব্রাহ্মণ পরিবারকে কেন্দ্র রেখে, ছোট একটা গ্রামকে নির্ভর করে গড়ে ওঠা উপন্যাসে লেখক দেখান, দুর্ভিক্ষ কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে।
ভাতের জন্য কাপালীদের ছোটবউ নিজের শরীর বিকিয়ে দেয় পরপুরুষের কাছে। ব্রাক্ষ্মন দুর্গা ভট্টাচার্য মন্বন্তরের অনাহার ও অন্নাভাবের কারণে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে কুণ্ঠিত হয় না। অনঙ্গ স্বামীকে লুকিয়ে অন্যের বাড়িতে ধান ভানার কাজ করে, শাক, লতা, মেটে আলু কুড়িয়ে স্বামী ছেলের মুখে খাবার তুলে দেয়। মানুষ ভাতের অভাবে শামুক গুগলি খাওয়া শুরু করে। তবুও শেষরক্ষা হয়না। মৃত্যু হানা দেয় নতুন গায়ে।
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা ‘চল্লিশের দিনগুলি’ কবিতার ভাষায় -
"মানুষগুলি তখন পোকামাকড়ের মতো মরে যাচ্ছিল'... 'সে বড় অদ্ভুত এক সময় / পলকা ঠুনকো কাচের বাসনের মতোই তখন ভেঙে যাচ্ছিল সব মূল্যবোধ।"
বিভূতিভূষণ পল্লীপ্রাণ সাহিত্যিক। অন্যান্য মহৎ সাহিত্যস্রষ্টার মত মানুষ,প্রকৃতি এবং ঈশ্বর তাঁর সৃষ্টির প্রধান উপাদান। 'অশনি সংকেত'-এ প্রকৃতি অল্পস্বল্প আছে, ঈশ্বর আছেন একেবারে গৌণ হয়ে, আর মানুষই এখানে মুখ্য। অখ্যাতির আড়ালে বিত্তহীন ম্লান জীবনযাপন করে যারা, তারাই এ উপন্যাসে ভিড় জমিয়েছে। এরা প্রায়ই অশিক্ষিত এবং সংস্কারাচ্ছন্ন কিন্তু চিত্তের অতুল ঐশ্বর্যে এরা অনেকেই মহত্ত্বের সীমা অতিক্রম করে গেছে। অভাবের তাড়নায় অস্থির হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জীবনের শেষ সম্বল মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে কাপালী-বৌ, ক্ষান্তমণি নামের এক বিধবা বালিকা লুকিয়ে গঙ্গাচরণের হাতে চাল তুলে দিয়েছে এই দুর্ভিক্ষেও, ব্রাহ্মণ্য অহংকারের পরিবর্তে চরম বিপর্যয়ের সময় গঙ্গাচরণ ও দিনু ভট্টাচার্যের মধ্যে জেগে ওঠে মানবধর্ম।
প্রবল ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টিরা থেমে থাকেনা। অশ্রুজলের মধ্যেও বেজে ওঠে আনন্দের মঙ্গল শঙ্খ, নবজাতকের আবির্ভাব ঘটে। চরম সংকটে মানুষ মানুষকে নিয়ে বাঁচতে শিখে। ভালোবাসার দেবী আশায় বীজ বুনে। স্বপ্ন দেখে তার উঠোন আবার ভরে উঠবে কুমড়ো, লাউ আর কচি লতায়।
তথ্যসূত্র:
১. ‘অশনি-সংকেত’: ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের সংস্কার ও মানবিকতার মূল্যবোধ , সুচিত্রা কড়ার
২. ‘অশনি সংকেত’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমর সাহিত্য প্রকাশন, ৭ টেমার লেন, কলকাতা ৯, প্রথম প্রকাশ ১৯৫৯, প্রথম ‘অমর’ সংস্করণ, পৌষ ১৩৭১

Comments
Post a Comment