Skip to main content

লিওনার্দ অয়লার

 রাজা চতুর্দশ লুই এর সময় পার করে ইউরোপের গণিতের পতাকা এখন ফরাসিদের হাতে।  অন্যদিকে নিউটন আর লিবনিজ এর মৃত্যুর পরে ব্রিটেন আর জার্মানিতে গণিতের প্রদিপ নিভু নিভু করছে।  


১৭৩০ - ১৮২০ এই নব্বই বছর সময় হলো ফরাসি এবং সুইস গণিতের স্বর্ণযুগ যুগ।  এই সময় ফ্রান্সের ছিলো ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,লিজেন্ডার, মনগে। আর সুইজারল্যান্ডের ছিলো অয়লার।  


বের্নুলি পরিবারের কারণে বাসেল এর নাম তখন গণিতবিদদের মুখে মুখে।  অন্যদিকে অয়লার এর কারণে তার সম্মান দ্বিগুণ হয়েছে।  


অয়লার এর পিতা ছিলেন একজন যাজক।  তিনি জ্যাক বের্নুলির কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।  মুলত, পিতার আগ্রহেই অয়লারের গণিতের জগতে প্রবেশ। ইউনিভার্সিটি অব বাসেলে পড়ার সময় জন বের্নুলি ছিলেন অয়লার এর শিক্ষক।  


মাত্র উনিশ বছর বয়সে জাহাজের মাস্তল নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমির কাছ থেকে পুরস্কৃত হন। 


১৭২৭ সালে জন বের্নুলির দুই ছেলে ড্যানিয়েল এবং নিকোলাস বের্নুলি  অনুরোধে  রাশিয়ার রানি ক্যাথরিন  অয়লারকে সেন্ট পিটার্সবার্গে আমন্ত্রণ জানান। 


১৭৩৫ সালে পিটার্সবার্গ একাডেমি একটি গাণিতিক সমস্যা উত্থাপন করে। অন্যান্য গণিতবিদরা সেটি সমাধানের জন্য কয়েকমাস সময় নিয়েছিলেন। অন্যদিকে অয়লার মাত্র তিনদিনে তার সমাধান করেছিলেন।  আর গাউস একই সমস্যাটি আরও উন্নত পদ্ধতিতে মাত্র একঘন্টায় সমাধান করেছিলেন। 


এইসময়ে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি তার ডান চোখটি হারান। আর, ১৭৬৬ সালে তিনি তার অন্য চোখটিও হারান । অন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে তার মন্তব্য ছিলো,  


        "  i will have less destruction. "


তিনি সারাজীবনে ৮৮৬ টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার মোট পরিমাণ ছিল ১৬০০ পৃষ্ঠা। গবেষণাপত্র প্রকাশে কেবল পল আরডস এর সাথেই তার তুলনা চলে।  ১৭৭৫ সাল থেকে তিনি প্রতি সপ্তাহে একটি করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। 


গণনায় তার দক্ষতা নিয়ে গণিতবিদ  ফ্রাসোয়া আরাগো মন্তব্য করেছেন, 


" He calculated without effort , just as men breathe and as eagles sustain themselves in the air . " 


১৭৪৭ সালে ফ্রেডেরিখ দ্যা গ্রেট এর আমন্ত্রনে তিনি বার্লিনে যান। তখন, প্রুশিয়ার রানি তার ভিতু এবং  চাপা স্বভাব নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলে, তার  উত্তর ছিলো সরল ,  


" ম্যাডাম আমি যে দেশ থেকে এসেছি সেখানে কেউ কথা বললেই ফাসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। " 


অয়লার ছিলেন ধর্মভীরু ।  ডি মরগ্যান তার মেমোয়ারে এর সম্পর্কে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।


ড্যানিশ ডিডেরট একবার ধর্ম নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলায় রানির বিরাগভাজন হয়েছিলেন।  কিন্তু, যুক্তিতে ডিরেরটকে পরাস্ত করতে না পেরে রানি অয়লার এর স্মরণাপন্ন হন। 


অয়লার ডিডেরটকে  বললেন আমি গণিতের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখাবো যে ঈশ্বর আছেন। তারপর তিনি আত্নবিশ্বাসের সাথে বললেন , 


" Monsieur , ( a+b^n)/ n  = x , donc dieu existe  ; respondez ! " 


অর্থাৎ,


  জনাব , ( a+b^n)/ n  = x ,  সুতরাং , ঈশ্বর আছে  ; প্রমানিত ! 


অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও তার গণিত চর্চায় কোনো ছেদ পড়েনি। অয়লার এর জীবন যেমন গণিতময় ছিলো, তার মৃত্যুও ছিলো গনিতময়।  চায়ের টেবিলে সিগারেট ফুকতে ফুকতে আর  গণিত নিয়ে আলোচনা করতে করতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। 


মার্কাস দ কন্ড্রসেট এর ভাষায়, 


"He ceased to calculate and he ceased to live." 


১৭৩৫ সালে ব্যাসেল প্রব্লেমটি সমাধানের মাধ্যমে অয়লার এর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বের্নুলিরা এর সমাধান করতে না পেরে অয়লার সাহায্য নেন। 


সমস্যাটি ছিলো, 1⁄12 + 1⁄22 + 1⁄32 + 1⁄42 … (জেটা ফাংশন, যার জেটা কন্সট্যান্ট ২) এর এক্সাক্ট মান বের করতে হবে ।


অয়লার এর বন্ধু ড্যানিয়েল বের্নুলি এর আনুমানিক মান পেয়েছিলেন ১৩/৫,  আর অয়লার এর এক্সাক্ট মান বের করেছিলেন  π^২/৬ । 


অয়লারকে বলা হয় সময়ের সেরা গণিতবিদ ।  জ্যামিতি, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি, বীজগণিত এবং  সংখ্যাতত্ত্বে ছিলো তার অবাধ বিচরণ। এছাড়াও, অপটিক্স,জোর্তিবিদ্যা, গ্রাফতত্ত্ব, বলবিদ্যা এবং সংগীতেও পারদর্শী ছিলেন। 


গণিতের অনেক নতুন সংকেত এর প্রচলন ,  যেমন,  e, i, f(x), Σ এবং a,b,c কে কন্সট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার, এছাড়াও,  x,y,z কে অজানা রাশি হিসেবে ব্যবহারের কৃতিত্ব দেয়া হয় অয়লারকে। পাই এর সংকেত হিসেবে  π কে জনপ্রিয়করণের কৃতিত্ব ও তার।


এগুলোর কয়েকটিকে একত্র করে তিনি  তৈরি করেছেন অয়লার ইকুয়েশন / অয়লার্স আইডেন্টিটি । যাকে বলা হয় সবচেয়ে সুন্দর গাণিতিক সমীকরণ। 


      

                 eiπ = -1    or    eiπ +1 = 0


এই সমীকরণটিতে তিনি সমন্বয় করেছেন অ্যারিথমেটিক, ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি এবং  কমপ্লেক্স অ্যানালাইসিস ।  এক্সপোনেশিয়াল, ত্রিকোণমিতি এবং কমপ্লেক্স নাম্বার ব্যবহার এর মাধ্যমে সমীকরণ তৈরিতে তিনি দক্ষ ছিলেন। 


এইরকম আরেকটা সমীকরণ হলো, অয়লার ফরমুলা, 


  


                       eix = cosx + isinx.  


গণিতবিদরা ভোটের মাধ্যমে সবচেয়ে সুন্দর  পাচটি গাণিতিক সমীকরণ নির্বাচিত করেন। যার মধ্যে তিনটিই অয়লারের। 


নেগেটিভ নাম্বার এর লগারিদম হতে পারে কি না এই প্রশ্নে লিবনিজ এবং জন বের্নুলির মধ্যে দ্বিমত ছিলো। 


বের্নুলি বলেন, 


যেহেতু,  


                         (-a) ^2 = (+a)^2


                   log(-a)^2 = log (+a)^2


                    2 log (-a) = 2 log (+a)


                       log (-a) = log (+a) 


অয়লার প্রমান করেন a এর অসীম সংখ্যক লগারিদম থাকতে পারে।  যার মধ্যে একটি পজিটিভ হবে।  


তিনি দেখান যে, log (-a)  এবং  log (+a) সমান না হলেও  log (-a)^2 = log (+a)^2  হতে পারে।  


গণিতপ্রেমি অয়লার একবার মহাকবি ভার্জিলের ঈনিড থেকেও একটি গাণিতিক সমস্যা খুজে পান। 


" the anchor drops, the rushing keel is staid. " 


ঈণিডের এই লাইনটি পড়ার সময় তার মনে প্রশ্ন জাগে, ওই সময় জাহাজের গতি কতো ছিলো। কথিত আছে,  ঈণিড মহাকাব্যটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি না দেখে একটানা মুখস্ত বলতে পারতেন।




Comments

Popular posts from this blog

শুন্য কিভাবে এলো

 অন্য সব সংখ্যার মতোই শুন্য এর উৎপত্তি কবে থেকে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শুন্য ছাড়া এই উপমহাদেশের (hindu numerals) সংখ্যা পদ্ধতির সাথে অন্য সংখ্যা পদ্ধতির পার্থক্য সামান্য। অন্য সংখ্যার সাথে শুন্য এর প্রধান পার্থক্য এর স্থানিক মানে। ভারতীয় উপমহাদেশে শুন্য এর সবচেয়ে প্রাচীন এবং নির্ভরযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় ৮৭৬ সালের এক শিলালিপিতে। গোয়ালিয়রে প্রাপ্ত এই শিলালিপিতে ৫০ এবং ২৭০ সংখ্যা দুটি লিখা ছিল শুন্য ব্যবহার করে। তবে শুন্য এর ইতিহাস আরও প্রাচীন। ব্যাবিলনীয়রা সংখ্যার অনুপস্থিতি নির্দেশ করার জন্য আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করত। তবে বর্তমানে আমরা যে কাজে শুন্য ব্যাবহার করে থাকি, ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতিতে তার কোনো ব্যবহার ছিলো না। গ্রিক পান্ডুলিপিতে স্থানিক মানের কিছু ব্যবহার দেখা যায়। ডিওফ্যান্টাস এর কাজে স্থানিক মানের প্রমান মিলে।  গ্রিকরা ওমিক্রন (O) চিহ্ন দ্বারা গর্ত নির্দেশ করতো। ব্রাক্ষ্মি লিপিতে শিং বিশিষ্ট একধরনের বৃত্তের(ছবি দ্রষ্টব্য) ব্যবহার দেখা যায়। যা ১০ নির্দেশ করতো। এই উপমহাদেশে ব্যবহৃত শুন্যের (০) সাথে আরবরা ৫ লেখার জন্য যে চিহ্ন ব্যাবহার করতো তার মিল ছিল। ...

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

 ল্যাপ্লাসকে যখন প্রশ্ন করা হতো জার্মানির সেরা গণিতবিদ কে ? , তার একটাই উত্তর ছিলো, ফ্যাফ(pfaff)। গাউস কে বাদ দিয়ে ফ্যাফ এর নাম শুনতে হবে এটা কোনো প্রশ্নকর্তা ই আশা করতেন না।  তারা যখন তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতেন, তাহলে গাউস কী ?  ল্যাপ্লাসের উত্তর ছিলো, আরে ও তো ইউরোপের সেরা।   মর্ডান অ্যানালাইসিস এ সেরা তিনজনের ( ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,গাউস) একজন হলেন গাউস । গাউস ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট । তবে, গাউস এর কাজের মাধ্যমেই গণিতের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।  নতুন আবিস্কারের নেশা এবং সক্ষমতায় তিনি তার পূর্ববর্তী গণিতবিদদেরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাণ এবং যথাযথ উপস্থাপনে একমাত্র গ্রিকদের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে ।  মাত্র বিশ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের পুরানো সব তত্ত্বকে  নতুন করে ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন প্রমাণ পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।  উপস্থাপনের সাবলীলতায় তিনি ল্যাপ্লাস এবং ল্যাগ্রাঞ্জকে ও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ইনফিনিট সিরিজ(পূর্ণাঙ্গরুপে), ইলিপটিক ফাংশন এর ডাবল পিরিওডিসিটি,লিস্ট স্কয়ার মেথড, ডিটারমিনেন্ট এর সিস্টেমেটিক ব্যবহার...