গণিতের ইতিহাস ১
গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবির্ভাবের সাথে কৃষিকাজের সম্পর্ক নিবিড়। কৃষিকাজের সাথে ঋতু পরিবর্তনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। গণনা পদ্ধতিতে যথেষ্ট পারদর্শী না হলে ঋতুপরিবর্তন সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনার যথাযথ হিসাব রাখা সম্ভব নয়। খ্রিস্টের জন্মের ৫৫০০ বছর পূর্বে সুমেরীয়রা প্রথম কৃষিকাজ শুরু করে। তারও প্রায় ১০০০ বছর পরে তারা বছর গণনা শুরু করে। বছরের প্রথম মাসের নাম রাখে বৃষ। সূর্যের অবস্থান ছিলো তখন বৃষ তারা মন্ডলে।
শহর নির্মানে এবং সেচ কাজে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় এবং ভারতীয়দের আশ্চর্য নৈপুণ্যের প্রমাণ আজও বিদ্যমান। গাণিতিক জ্ঞান ছাড়া এই ধরনের কাজ এতো নিপুণভাবে করা সম্ভব নয়।
ব্যবসা বানিজ্যের প্রসারে গণিতের রয়েছে অসামান্য অবদান। সুমের, এলাম, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি শত সহস্র মাইল ব্যবধানে অবস্থিত নানা জনপদের মধ্যে বানিজ্য সম্ভব হয়েছিল পাটিগণিতের ব্যবহারের মাধ্যমে।
ব্যাবিলনীয়রা নরম মাটির চাকতির উপরে বিভিন্ন ধরনের হিসাব নিকাশ, গাণিতিক পদ্ধতি লিখে রাখতো। পরে চাকতিগুলোকে আগুনের তাপে পুড়িয়ে সংরক্ষণ করতো। ব্যাবিলনীয় লিপিকে বলা হতো কিউনিফর্ম।
অসূরবনিপালের (খ্রীস্টপূর্ব ৬২৬) গ্রন্থাগারে এইধরনের ২২০০০ চাকতি পাওয়া গিয়েছে। এগুলো এখন বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। নিপপুর মন্দিরের গ্রন্থাগারে খ্রীস্টপূর্ব ৩০০০-৪৫০ অব্দের মধ্যে লিখিত প্রায় ৫০০০০ কিউনিফর্ম চাকতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
কিউনিফর্ম লিপির সাহায্যে ১ লিখতে ব্যবহৃত হতো | চিহ্ন। ১০ লিখতে ব্যবহৃত হতো < চিহ্ন। ১০০ লিখতে ব্যবহৃত হতো | - চিহ্ন।
| | | = ৩
} যোগের ধারণা
< < < = ৩০
< | - = ১০০০ একশ এর দশ গুণ।
} গুণের ধারণা
< < | - = ১০০০০ একহাজার এর দশ গুণ।
উপরের সংখ্যা পদ্ধতিটি দশ ভিত্তিক। সম্ভবত হাতের বা পায়ের দশটি আংগুল থেকেই দশ ভিত্তিক পদ্ধতির উদ্ভব। কিন্তু, অনেকের মতে দশ ভিত্তিক পদ্ধতির থেকে বারো ভিত্তিক পদ্ধতি বেশি সুবিধাজনক। কারণ, ১২ সংখ্যাটি ২,৩,৪,৬ দ্বারা বিভাজ্য। অন্যদিকে, ১০ সংখ্যাটি কেবলমাত্র ২ এবং ৫ দ্বারা বিভাজ্য। তবে, ১২ ভিত্তিক পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা আছে। এটি ৫ দ্বারা বিভাজ্য নয়।
এইসব বিষয় বিবেচনা করে হয়তো ব্যাবিলনীয়রা ষাট ভিত্তিক বা সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি আবিষ্কার করে। সময় নির্ণয়ে এখনো ষাট ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্যাবিলনীয়রা শূন্য স্থান নির্দেশ করতে
<
<
চিহ্ন ব্যবহার করতো। তবে, সংখ্যার মধ্যের শুন্যের জন্য একটি স্থান ফাকা রাখতো। তাড়াতাড়ি গণনা ও হিসাব করার জন্য তারা কতগুলো তালিকা মুখস্ত রাখতো ।
ই.টি.বেল এর মতে, ব্যাবিলনীয়রা বীজগণিতের ব্যবহার জানতো। তবে, সিম্বলের মাধ্যমে বীজগণিতের ব্যবহার শুরু হয় তারও ২০০০ বছর পরে ডিওফ্যান্টাস হাতে। তারা মনে করতো দ্বিঘাত সমীকরণ এর একটি মাত্র মূল।
অমূলদ সংখ্যা সম্পর্কে তাদের অস্পষ্ট ধারণা ছিলো। অমূলদ সংখ্যার বর্গমূল নির্ণয়ে তাদেরকে
(a^2 + b^2) ^.5 = a + b^2 /2a
এই ধরনের একটি সুত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়।
২০০০ বছর পরে আলেকজান্দ্রিয়ার হিয়েরো এই নিয়মটি পুনরায় সবার সম্মুখে আনেন। অমুলদ রাশি √২ এর মান ব্যাবিলনীয় লিপিতে ১+ ৫/১২ পাওয়া যায়। যা দশমিকের পরে দুইঘর পর্যন্ত শুদ্ধ।
ব্যাবিলনীয় জ্যামিতি, তাদের পাটীগণিত ও বীজগণিতের মতো এতো সমৃদ্ধ নয়। তবে, তাদের অবদান একেবারে কম নয়। বৃত্তের জ্ঞান যথেষ্ট উন্নত।
ব্যাসার্ধের সমান জ্যা বৃত্তের কেন্দ্রে ৬০° কোন উৎপন্ন করে এবং মোটামুটিভাবে এই জ্যা যে বৃত্তের মধ্যে অংকিত সুষম ষড়ভুজের বাহুর সমান, এটা তারা জানতো।
বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত অর্থাৎ পাই এর মান ব্যাবিলনীয়রা ৩ ব্যবহার করতো। ৩,৪,৫ দ্বারা যে একটি সমকোণী ত্রিভুজ হয় তার সম্পর্কেও তাদের ধারণা ছিলো।
খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের আগে থেকেই ব্যাবিলনীয়রা ৩০ দিনে মাস, ১২ মাসে বছর, এবং একবছরে ৩৬০ দিন হিসাবে ঋতু গণনা করতো। কিন্তু, কয়েক বছর পরপর বাকি ৫ দিনের গড়মিলের কারণে ঋতু পরিবর্তন এর হিসেবেও গড়মিল দেখা দেয়। তাই তারা কয়েক বছর অন্তর অন্তর ১৩ মাসে বছর ধরতে শুরু করে। এই মাসটির নাম দেয় 'মল মাস '। এই মাসে সর্বপ্রকার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ছিলো।
এছাড়াও,খালি চোখে যে ৭ টি গ্রহ দেখা যায় ( ৬ টি গ্রহ + ১ টি চাঁদ) সেগুলোকে বিভিন্ন দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো ; ৭ দিনে একসপ্তাহ এবং গ্রহগুলোর নামে বারগুলোর নাম দিয়েছিল। গ্রহগুলোর ঔজ্জ্বল্যের ক্রমানুসারে দিন / বারের নামগুলো দেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে উজ্জ্বলটি সবার শেষে।
গ্রহ শনি বৃহস্পতি মঙ্গল রবি শুক্র বুধ চন্দ্র
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭
দেবতা নিনিব মার্দুক নের্গাল শামাশ ইশতার নাবু সিন্
অর্থ মড়ক রাজা যুদ্ধ ন্যায় প্রেম লেখন কৃষি
ব্যাবিলনীয়রা দিনকে ২৪ ঘন্টায় ভাগ করেছিলো। তারা বিশ্বাস করতো ৭ জন দেবতা ঘুরে ঘুরে প্রতিঘন্টার উপর নজর রাখে। একটি নতুন দিনের শুরুতে প্রথম ঘন্টায় যে দেবতার পাহারা দেয়ার কথা তার নামে ঐ দিনটি উৎসর্গ করা হতো।
Comments
Post a Comment