Skip to main content

গণিতের ইতিহাস ১

 

0️⃣💠
গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবির্ভাবের সাথে কৃষিকাজের সম্পর্ক নিবিড়। কৃষিকাজের সাথে ঋতু পরিবর্তনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। গণনা পদ্ধতিতে যথেষ্ট পারদর্শী না হলে ঋতুপরিবর্তন সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনার যথাযথ হিসাব রাখা সম্ভব নয়। খ্রিস্টের জন্মের ৫৫০০ বছর পূর্বে সুমেরীয়রা প্রথম কৃষিকাজ শুরু করে। তারও প্রায় ১০০০ বছর পরে তারা বছর গণনা শুরু করে। বছরের প্রথম মাসের নাম রাখে বৃষ। সূর্যের অবস্থান ছিলো তখন বৃষ তারা মন্ডলে।
শহর নির্মানে এবং সেচ কাজে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, মিশরীয় এবং ভারতীয়দের আশ্চর্য নৈপুণ্যের প্রমাণ আজও বিদ্যমান। গাণিতিক জ্ঞান ছাড়া এই ধরনের কাজ এতো নিপুণভাবে করা সম্ভব নয়।
ব্যবসা বানিজ্যের প্রসারে গণিতের রয়েছে অসামান্য অবদান। সুমের, এলাম, মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা প্রভৃতি শত সহস্র মাইল ব্যবধানে অবস্থিত নানা জনপদের মধ্যে বানিজ্য সম্ভব হয়েছিল পাটিগণিতের ব্যবহারের মাধ্যমে।
1️⃣💠
ব্যাবিলনীয়রা নরম মাটির চাকতির উপরে বিভিন্ন ধরনের হিসাব নিকাশ, গাণিতিক পদ্ধতি লিখে রাখতো। পরে চাকতিগুলোকে আগুনের তাপে পুড়িয়ে সংরক্ষণ করতো। ব্যাবিলনীয় লিপিকে বলা হতো কিউনিফর্ম।
অসূরবনিপালের (খ্রীস্টপূর্ব ৬২৬) গ্রন্থাগারে এইধরনের ২২০০০ চাকতি পাওয়া গিয়েছে। এগুলো এখন বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। নিপপুর মন্দিরের গ্রন্থাগারে খ্রীস্টপূর্ব ৩০০০-৪৫০ অব্দের মধ্যে লিখিত প্রায় ৫০০০০ কিউনিফর্ম চাকতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
কিউনিফর্ম লিপির সাহায্যে ১ লিখতে ব্যবহৃত হতো | চিহ্ন। ১০ লিখতে ব্যবহৃত হতো < চিহ্ন। ১০০ লিখতে ব্যবহৃত হতো | - চিহ্ন।
| | | = ৩
} যোগের ধারণা
< < < = ৩০
< | - = ১০০০ একশ এর দশ গুণ।
} গুণের ধারণা
< < | - = ১০০০০ একহাজার এর দশ গুণ।
2️⃣💠
উপরের সংখ্যা পদ্ধতিটি দশ ভিত্তিক। সম্ভবত হাতের বা পায়ের দশটি আংগুল থেকেই দশ ভিত্তিক পদ্ধতির উদ্ভব। কিন্তু, অনেকের মতে দশ ভিত্তিক পদ্ধতির থেকে বারো ভিত্তিক পদ্ধতি বেশি সুবিধাজনক। কারণ, ১২ সংখ্যাটি ২,৩,৪,৬ দ্বারা বিভাজ্য। অন্যদিকে, ১০ সংখ্যাটি কেবলমাত্র ২ এবং ৫ দ্বারা বিভাজ্য। তবে, ১২ ভিত্তিক পদ্ধতিরও সীমাবদ্ধতা আছে। এটি ৫ দ্বারা বিভাজ্য নয়।
এইসব বিষয় বিবেচনা করে হয়তো ব্যাবিলনীয়রা ষাট ভিত্তিক বা সেক্সাজেসিমাল পদ্ধতি আবিষ্কার করে। সময় নির্ণয়ে এখনো ষাট ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
⭕ ছবিতে ষাট ভিত্তিক পদ্ধতির একটি উদাহরণ দেখানো হয়েছে। মূলত, ১২৩ হলো বর্তমানের ৩৭২৩। ব্যাবিলনীয় চাকতিগুলোতে বর্গরাশিরও সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।
⭕ চিত্রের, ১.৪ = ১×৬০ + ৪ = ৬৪ (৮^২) ।
3️⃣💠
ব্যাবিলনীয়রা শূন্য স্থান নির্দেশ করতে
<
<
চিহ্ন ব্যবহার করতো। তবে, সংখ্যার মধ্যের শুন্যের জন্য একটি স্থান ফাকা রাখতো। তাড়াতাড়ি গণনা ও হিসাব করার জন্য তারা কতগুলো তালিকা মুখস্ত রাখতো ।
4️⃣💠
ই.টি.বেল এর মতে, ব্যাবিলনীয়রা বীজগণিতের ব্যবহার জানতো। তবে, সিম্বলের মাধ্যমে বীজগণিতের ব্যবহার শুরু হয় তারও ২০০০ বছর পরে ডিওফ্যান্টাস হাতে। তারা মনে করতো দ্বিঘাত সমীকরণ এর একটি মাত্র মূল।
অমূলদ সংখ্যা সম্পর্কে তাদের অস্পষ্ট ধারণা ছিলো। অমূলদ সংখ্যার বর্গমূল নির্ণয়ে তাদেরকে
(a^2 + b^2) ^.5 = a + b^2 /2a
এই ধরনের একটি সুত্র ব্যবহার করতে দেখা যায়।
২০০০ বছর পরে আলেকজান্দ্রিয়ার হিয়েরো এই নিয়মটি পুনরায় সবার সম্মুখে আনেন। অমুলদ রাশি √২ এর মান ব্যাবিলনীয় লিপিতে ১+ ৫/১২ পাওয়া যায়। যা দশমিকের পরে দুইঘর পর্যন্ত শুদ্ধ।
5️⃣💠
ব্যাবিলনীয় জ্যামিতি, তাদের পাটীগণিত ও বীজগণিতের মতো এতো সমৃদ্ধ নয়। তবে, তাদের অবদান একেবারে কম নয়। বৃত্তের জ্ঞান যথেষ্ট উন্নত।
ব্যাসার্ধের সমান জ্যা বৃত্তের কেন্দ্রে ৬০° কোন উৎপন্ন করে এবং মোটামুটিভাবে এই জ্যা যে বৃত্তের মধ্যে অংকিত সুষম ষড়ভুজের বাহুর সমান, এটা তারা জানতো।
বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত অর্থাৎ পাই এর মান ব্যাবিলনীয়রা ৩ ব্যবহার করতো। ৩,৪,৫ দ্বারা যে একটি সমকোণী ত্রিভুজ হয় তার সম্পর্কেও তাদের ধারণা ছিলো।
6️⃣💠
খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের আগে থেকেই ব্যাবিলনীয়রা ৩০ দিনে মাস, ১২ মাসে বছর, এবং একবছরে ৩৬০ দিন হিসাবে ঋতু গণনা করতো। কিন্তু, কয়েক বছর পরপর বাকি ৫ দিনের গড়মিলের কারণে ঋতু পরিবর্তন এর হিসেবেও গড়মিল দেখা দেয়। তাই তারা কয়েক বছর অন্তর অন্তর ১৩ মাসে বছর ধরতে শুরু করে। এই মাসটির নাম দেয় 'মল মাস '। এই মাসে সর্বপ্রকার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ছিলো।
7️⃣💠
এছাড়াও,খালি চোখে যে ৭ টি গ্রহ দেখা যায় ( ৬ টি গ্রহ + ১ টি চাঁদ) সেগুলোকে বিভিন্ন দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো ; ৭ দিনে একসপ্তাহ এবং গ্রহগুলোর নামে বারগুলোর নাম দিয়েছিল। গ্রহগুলোর ঔজ্জ্বল্যের ক্রমানুসারে দিন / বারের নামগুলো দেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে উজ্জ্বলটি সবার শেষে।
গ্রহ শনি বৃহস্পতি মঙ্গল রবি শুক্র বুধ চন্দ্র
১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭
দেবতা নিনিব মার্দুক নের্গাল শামাশ ইশতার নাবু সিন্
অর্থ মড়ক রাজা যুদ্ধ ন্যায় প্রেম লেখন কৃষি
ব্যাবিলনীয়রা দিনকে ২৪ ঘন্টায় ভাগ করেছিলো। তারা বিশ্বাস করতো ৭ জন দেবতা ঘুরে ঘুরে প্রতিঘন্টার উপর নজর রাখে। একটি নতুন দিনের শুরুতে প্রথম ঘন্টায় যে দেবতার পাহারা দেয়ার কথা তার নামে ঐ দিনটি উৎসর্গ করা হতো।

Comments

Popular posts from this blog

শুন্য কিভাবে এলো

 অন্য সব সংখ্যার মতোই শুন্য এর উৎপত্তি কবে থেকে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শুন্য ছাড়া এই উপমহাদেশের (hindu numerals) সংখ্যা পদ্ধতির সাথে অন্য সংখ্যা পদ্ধতির পার্থক্য সামান্য। অন্য সংখ্যার সাথে শুন্য এর প্রধান পার্থক্য এর স্থানিক মানে। ভারতীয় উপমহাদেশে শুন্য এর সবচেয়ে প্রাচীন এবং নির্ভরযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় ৮৭৬ সালের এক শিলালিপিতে। গোয়ালিয়রে প্রাপ্ত এই শিলালিপিতে ৫০ এবং ২৭০ সংখ্যা দুটি লিখা ছিল শুন্য ব্যবহার করে। তবে শুন্য এর ইতিহাস আরও প্রাচীন। ব্যাবিলনীয়রা সংখ্যার অনুপস্থিতি নির্দেশ করার জন্য আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করত। তবে বর্তমানে আমরা যে কাজে শুন্য ব্যাবহার করে থাকি, ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতিতে তার কোনো ব্যবহার ছিলো না। গ্রিক পান্ডুলিপিতে স্থানিক মানের কিছু ব্যবহার দেখা যায়। ডিওফ্যান্টাস এর কাজে স্থানিক মানের প্রমান মিলে।  গ্রিকরা ওমিক্রন (O) চিহ্ন দ্বারা গর্ত নির্দেশ করতো। ব্রাক্ষ্মি লিপিতে শিং বিশিষ্ট একধরনের বৃত্তের(ছবি দ্রষ্টব্য) ব্যবহার দেখা যায়। যা ১০ নির্দেশ করতো। এই উপমহাদেশে ব্যবহৃত শুন্যের (০) সাথে আরবরা ৫ লেখার জন্য যে চিহ্ন ব্যাবহার করতো তার মিল ছিল। ...

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

 ল্যাপ্লাসকে যখন প্রশ্ন করা হতো জার্মানির সেরা গণিতবিদ কে ? , তার একটাই উত্তর ছিলো, ফ্যাফ(pfaff)। গাউস কে বাদ দিয়ে ফ্যাফ এর নাম শুনতে হবে এটা কোনো প্রশ্নকর্তা ই আশা করতেন না।  তারা যখন তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতেন, তাহলে গাউস কী ?  ল্যাপ্লাসের উত্তর ছিলো, আরে ও তো ইউরোপের সেরা।   মর্ডান অ্যানালাইসিস এ সেরা তিনজনের ( ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,গাউস) একজন হলেন গাউস । গাউস ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট । তবে, গাউস এর কাজের মাধ্যমেই গণিতের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।  নতুন আবিস্কারের নেশা এবং সক্ষমতায় তিনি তার পূর্ববর্তী গণিতবিদদেরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাণ এবং যথাযথ উপস্থাপনে একমাত্র গ্রিকদের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে ।  মাত্র বিশ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের পুরানো সব তত্ত্বকে  নতুন করে ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন প্রমাণ পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।  উপস্থাপনের সাবলীলতায় তিনি ল্যাপ্লাস এবং ল্যাগ্রাঞ্জকে ও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ইনফিনিট সিরিজ(পূর্ণাঙ্গরুপে), ইলিপটিক ফাংশন এর ডাবল পিরিওডিসিটি,লিস্ট স্কয়ার মেথড, ডিটারমিনেন্ট এর সিস্টেমেটিক ব্যবহার...

লিওনার্দ অয়লার

 রাজা চতুর্দশ লুই এর সময় পার করে ইউরোপের গণিতের পতাকা এখন ফরাসিদের হাতে।  অন্যদিকে নিউটন আর লিবনিজ এর মৃত্যুর পরে ব্রিটেন আর জার্মানিতে গণিতের প্রদিপ নিভু নিভু করছে।   ১৭৩০ - ১৮২০ এই নব্বই বছর সময় হলো ফরাসি এবং সুইস গণিতের স্বর্ণযুগ যুগ।  এই সময় ফ্রান্সের ছিলো ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,লিজেন্ডার, মনগে। আর সুইজারল্যান্ডের ছিলো অয়লার।   বের্নুলি পরিবারের কারণে বাসেল এর নাম তখন গণিতবিদদের মুখে মুখে।  অন্যদিকে অয়লার এর কারণে তার সম্মান দ্বিগুণ হয়েছে।   অয়লার এর পিতা ছিলেন একজন যাজক।  তিনি জ্যাক বের্নুলির কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।  মুলত, পিতার আগ্রহেই অয়লারের গণিতের জগতে প্রবেশ। ইউনিভার্সিটি অব বাসেলে পড়ার সময় জন বের্নুলি ছিলেন অয়লার এর শিক্ষক।   মাত্র উনিশ বছর বয়সে জাহাজের মাস্তল নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমির কাছ থেকে পুরস্কৃত হন।  ১৭২৭ সালে জন বের্নুলির দুই ছেলে ড্যানিয়েল এবং নিকোলাস বের্নুলি  অনুরোধে  রাশিয়ার রানি ক্যাথরিন  অয়লারকে সেন্ট পিটার্সবার্গে আমন্ত্রণ জানান।  ১৭৩৫ স...