অ্যাবেল পদক

 গণিতে  অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ  'অ্যাবেল পুরস্কার' প্রদান করা হয় । নরওয়েজিয়ান অ্যাকাডেমি অব সাইন্স এন্ড লেটারর্স, ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর অ্যাবেল পুরস্কার প্রদান করে আসছে ।  এই পুরস্কার এর প্রাইজমানি ৭.৫ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার। 


মুলত, নোবেল পুরষ্কার এর বিকল্প হিসেবে এটি প্রদান করা হয়।  ১৮৯৯ সালে গণিতবিদ সোপাস লি (Lie)  জানতে পারেন , আলফ্রেড নোবেল নোবেল পুরষ্কার প্রবর্তন করবেন ; পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্রকে নোবেল পুরষ্কারের জন্য বিবেচনা করা হলেও গণিতকে বাদ দেয়া হয়েছে। তার অনুরোধে ১৯০২ সালে  নরওয়ে এবং সুইডেন যৌথভাবে গণিতে অবদানের জন্য একটি পুরস্কার প্রবর্তনে সম্মত হয়। কিন্তু, ১৯০৫ সালে নরওয়ে সুইডেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। 


২০০১ সালে নরওয়েজিয়ান সাইন্স একাডেমি ১৮৯৯ সালের প্রস্তাবটিকে পুনর্বিবেচনা  করার জন্য  নরওয়ের সরকারকে অনুরোধ করে।  পরবর্তীতে,  ২০০৩ সাল থেকে নরওয়ের সরকার এর আর্থিক সহায়তায় এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। ২০০২ সালে অ্যাটলি সেলবার্গকে সম্মানসূচক অ্যাবেল পদক প্রদান করা হয়। 


বর্তমান সময়ের নরওয়ে আর আঠারো শতকের নরওয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক।  তখন  নরওয়ে ছিলো ডেনমার্কের উপনিবেশ।  ১৭৯৪ সালে নেপোলিয়নিক ওয়ার এর সময় ডেনমার্ক নিরপেক্ষতা নীতি অবলম্বন করে।  কিন্ত, ১৮০১ সালে, ব্রিটিশরা সন্দেহের বশে, ড্যানিশ নৌ বাহিনীর অর্ধেক ধ্বংস করে দেয়।  


তবু্ও, ডেনমার্ক - নরওয়ে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে।  কিন্তু, ১৮০৭ সালে ব্রিটিশরা ডেনমার্কের নৌঘাটিগুলো দখল করে নিলে ডেনমার্ক ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়। 


এমতাবস্থায়, ডেনমার্ক ব্রিটিশদের উপর বানিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে। নরওয়ের টিম্বারের চালানের উপর বিট্রিশরা নির্ভরশীল ছিল।  ড্যানিশরা নরওয়ে থেকে ব্রিটেনে  টিম্বার রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। নরওয়েতে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় । পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ব্রিটিশরা নরওয়ে অবরোধ করে। নরওয়ে  খাদ্য শষ্যের জন্য ব্রিটেনের উপর নির্ভরশীল ছিল । ব্রিটিশরা নরওয়েতে  খাদ্য শষ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।  ফলে,  নরওয়েতে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়। 


১৮১৩ সালে সুইডেন ডেনমার্ক আক্রমণ করে।  ১৮১৪ সালের জানুয়ারি মাসে কিয়েল চুক্তির মাধ্যমে নরওয়ে  সুইডেন এর অন্তর্ভুক্ত হয়।  


এর কয়েকমাস পরে নরওয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ফলাফল,  সুইডেন নরওয়ে আক্রমণ করে  এবং দখল করে দখল করে নেয়। এবং নরওয়েতে স্বায়ত্তশাসন দেয়। যা, ক্রিস্টিয়ানা ( বর্তমান অসলো) থেকে পরিচালিত হতো।


অ্যাবেলের পিতা নরওয়ের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৮১৪ সালে নরওয়েতে যে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এর কাজ শুরু হয় অ্যাবেলের পিতা তাতে যুক্ত ছিলেন।  কিন্তু, সহকর্মীর নামে মিথ্যা অভিযোগ এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে অব্যহতি দেয়া হয়।  এবং তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৮২০ সালে তার পিতার মৃত্যু হয়। 


নিলস্ হেনরিখ অ্যাবেলের জন্ম ১৮০২ সালে নরওয়ের নেডস্ট্যাডে ।  ১৮১৮ সাল পর্যন্ত অ্যাবেলের গণিত প্রতিভার কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। 


১৮১৮ সালে বি হলম্বি ক্যাথেড্রাল স্কুলে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি গণিতের মৌলিক সমস্যাগুলোকে ছাত্রছাত্রীদের কাছে তুলে ধরতেন ৷ এরপর থেকেই অ্যাবেলের গণিতের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে থাকে। 


(২০০৫ সাল থেকে শিক্ষকতায় অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ নরওয়ে সরকার প্রতিবছর হলম্বি পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ) 


ক্যাথিড্রাল স্কুলে থাকাকালীন সময়ে 'কুইন্টিক ইকুয়েশন' এর সাথে তার পরিচয় ঘটে। যার সমাধান প্রায় ২৫০ বছর ধরে গণিতবিদদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলো ।  তিনি পরবর্তী কয়েক বছর এই সমস্যাটি সমাধান এর পিছনে ব্যয় করেন। 


তিনি এই সমস্যাটির সমাধান করতে গিয়ে গণিতের নতুন শাখা গ্রুপ থিওরি'র(গ্যালোয়া ও আলাদাভাবে করেছেন) আবিষ্কার করেন। ১৮২৩ সালে তিনি প্রমাণ করেন যে, পাঁচ মাত্রার ইকুয়েশন / কুইন্টিক ইকুয়েশন এর অ্যালজেবরাইক সল্যুশন সম্ভব নয়।  ১৮২৪ সালে গাউস কে এই প্রমাণটি র একটি কপি প্রেরণ করেন।  কিন্তু, গাউস একে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেন। 


১৮২৬ সালে অ্যাবেল জার্মানিতে গেলেও গাউস এর সাথে দেখা না করেই চলে আসেন। 


গাউস লেখার ধরণ সম্পর্কে অ্যাবেলের মন্তব্য ছিলো


"He is like the fox, who effaces his tracks in the sand with his tail." 


অ্যাবেল ই প্রথম ইন্টিগ্রাল ইকুয়েশন এর সলুশ্যন বের করেন, যা বাইনোমিয়াল ইকুয়েশন এর জেনারেল প্রুফ তৈরিতে সাহায্য করে। 


ইলিপটিক ইন্টিগ্রাল, ইলিপটিক ফাংশন নিয়েও কাজ করেছিলেন।  তবে, গণিতে তার সবথেকে বড় অবদান হলো অ্যাবেলিয়ান ফাংশন।  


প্যারিসে থাকাকালে তিনি কসি এবং লেজেন্ডারকে এই সম্পর্কিত একটি গবেষণাপত্র এক্সামিন করতে দেন। কিন্তু তারা, অ্যাবেলের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এর সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। 


১৮২৯ সালে, সিরিল'স জার্নালে এটি প্রকাশিত হয়।  এবং, রেফারেন্স হিসেবে কসি এবং লেজেন্ডার এর কাছে থাকা গবেষণাপত্রের কথা বলা হয়।  


পরবর্তীতে, জ্যাকোবি লেজেন্ডারের কাছে গবেষণাপত্রটির কথা উল্লেখ করলে তিনি মন্তব্য করেন, 


অ্যাবেলের হাতের লেখা বুঝি নাই।  তাকে আরও কপি প্রেরণ করতে বলেছিলাম কিন্ত,  সে কোনো আগ্রহ দেখায় নাই। 


এই কপিটি ১৮৪১ সাল পর্যন্ত কসির কাছে অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিলো।  তিনি এটির প্রুফ রিড করার সময় হারিয়ে ফেলেন। 


১৮২৬ এ লিখিত গবেষণাপত্রের এই কপিতে অ্যাবেল ফাংশন এর বিভিন্ন থিওরাম এর জেনারেল প্রুফ ছিলো বলে ধারণা করা হয়। 


অ্যাবেল গণিত নিয়ে কাজ করেছিলেন মাত্র সাত বছর। কিন্ত, তা গণিতবিদদেরকে এখনো ব্যাতিব্যাস্ত করে রেখেছে। 


ফরাসি গণিতবিদ হার্মাইট এর ভাষায়, 


"Abel has left mathematicians enough to keep them busy for five hundred years."


অ্যাবেলের কাজ গুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়, 


১| সল্যুশন অব অ্যালজেব্রাইক ইকুয়েশন বাই র‍্যাডিক্যালস। 


২| ইলিপ্টিক ইন্টিগ্রাল এর ট্রান্সেডেনটাল ফাংশন, ইলিপ্টিক ফাংশন,  অ্যাবেলিয়ান ইন্টিগ্রালস,


৩| ফাংশনাল ইকুয়েশন 


৪| ইন্টিগ্রাল ফাংশন 


৫| গ্রুপ থিওরি 


অ্যাবেলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি এতো অল্প সময়ে গণিত নিয়ে এতো কাজ কিভাবে করলেন। অ্যাবেলের উত্তর ছিলো, 


    " I read the masters, not their pupils. "

Comments

Popular posts from this blog

শুন্য কিভাবে এলো

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

আর্কিমিডিস