Skip to main content

গণিতের স্কুল-২

 পীথাগোরাস(খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০-৫০০ আনুমানিক ) এবং তার স্কুলকে নিয়ে যতো আলোচনা করা হয়েছে তার কোনো সমসাময়িক অথবা তার পূর্বসূরি কিংবা উত্তরসূরিদের নিয়ে এতো আলোচনা করা হয়নি। তাকে নিয়ে এতো এতো গল্পের জন্ম হয়েছে যার সত্যি মিথ্যা যাচাই করাও এক দুরুহ কাজ। হয়তো, তিনি জীবিত থাকাকালে তার কাজের সম্পর্কে ' পীথাগোরিয়ান স্কুল ' এর বাইরে কাউকে জানতে না দেয়ার কারণে এই বিপত্তি । পীথাগোরাস ছিলেন সামোস দ্বীপের বাসিন্দা। পেরিসাইডেস এর দর্শনলাভের জন্য তিনি সিরোস দ্বীপ ভ্রমণ করেন। এরপর থেলিস এর উপদেশে মিশর ভ্রমণ করেন। ভ্রমণ শেষে যখন তিনি সামোসে ফিরে আসেন তখন সামোস দ্বীপের রাজা ছিলেন অত্যাচারী পলিক্রেটিস। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অন্যদের মতো তিনিও সামোস ত্যাগ করে দক্ষিণ ইটালিতে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে ইটালির ক্রোটন শহরে 'পীথাগোরিয়ান স্কুল ' এর গোড়াপত্তন করেন।


' পীথাগোরিয়ান স্কুল ' এর কার্যক্রম ছিলো অনেকটা সন্ন্যাসীদের আশ্রমের মতো। সকল কাজে তারা গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন । পীথাগোরিয়ান ভ্রাতৃত্ববোধ এতটাই প্রবল ছিলো তারা নিজেদের সকল আবিষ্কারকে পীথাগোরিয়ান স্কুল এর আবিষ্কার হিসেবে বর্ণনা করতো এবং তাদের সকল আবিষ্কারকে তারা মহান দেবতা সেক্ট পক্ষ থেকে উপহারস্বরুপ মনে করতো। 

' পীথাগোরিয়ান স্কুল ' এর অনুসারীর সংখ্যা অল্পদিনেই ব্যপক পরিমানে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু, তাদের এই গোপনীয়তা, এবং কার্যকলাপে মিশরীয় সংস্কৃতির প্রভাব ইটালির কিছু অংশের মানুষের মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। সন্দেহের বশে তারা ' পীথাগোরিয়ান স্কুল ' এর ভবনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পীথাগোরাস প্রথমে টারেনটাম এ পালিয়ে যান , পরে মেটাপনটাম এর নিকট খুন হন।


পীথাগোরিয়ান জ্যামিতি সংখ্যাতত্ত্বের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত ছিলো । মিশরীয়দের মতো পীথাগোরিয়ানরাও ক্ষেত্র জ্যামিতি (areas) নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলো। "সমকোণী ত্রিভুজ এর ক্ষেত্রে অতিভুজ এর বর্গ হলো ভূমির বর্গ এবং লম্বের বর্গের যোগফলের সমান।" ভিট্রুভিয়াস এর মতে, ৩-৪-৫ এর এই বিশেষ প্রমানটি পীথাগোরাসের করা।ধারণা করা হয় তিনি এটি মিশরীয়দের কাছ থেকে শিখেছিলেন। তবে ভারতীয় উপমহাদেশ এর নামও এর সাথে জড়িয়ে আছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে লিখিত অপস্থম্ভ এর 'শুলব্ সূত্র ' বইতে ১৫-৩৬-৩৯(=৫,১২,১৩) ব্যবহার করে সমকোণী ত্রিভুজ গঠনের কথা বলা আছে। তৃতীয় সংহিতা, শতপথ ব্রাহ্মণেও এই ধরনের সমস্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। শুলব সুত্রে এগুলোকে rational rectangle বলা হয়েছে। অর্থাৎ, যেসব চতুর্ভুজ এর বাহু এবং কর্ণ মুলদ। অপস্থম্ভ তার বইতে ৭ টি rational right-angled triangle এর বলেছিলেন। (৩,৪,৫),(৫,১২,১৩),(৮,১৫,১৭),(১২,৩৫,৩৭)। বাকি তিনটি এদের জাত। 'বোধোয়ন' এ (৭,২৪,২৫) এর উল্লেখ পাওয়া যায়। 'বোধোয়ন' শুলব সুত্রের থেকেও প্রাচীন। অপস্থম্ভ তার শুলব সুত্রে বলেন এই ধরনের আরও ত্রিভুজ গঠন করা যায় । তবে এই বইগুলোর কোনোটিতেই এর সাধারণ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পীথাগোরাসের উপপাদ্য এর ইউক্লিডীয় প্রমাণটি ইউক্লিড এর নিজের। আর, পীথাগোরিয়ান প্রমাণটি তার আগে পর্যন্ত কনজেকচার হিসেবে ছিলো। 


ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি দুই সমকোণ এই উপপাদ্যটি পীথাগোরিয়ানরা প্রমান করেছিলেন। তবে তাদের প্রমাণ আর ইউক্লিডীয় প্রমাণের মধ্যে একটু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। n-ভুজ বিশিষ্ট বহুভুজ এর অন্তঃস্থ কোণের সমষ্টি (2n-4)। বহুভুজ এর বহিঃস্থ কোণের সমষ্টি চার সমকোণ। এই প্রতিজ্ঞাগুলোও পীথাগোরিয়ানদের অবদান। 


পীথাগোরাস বলেন সবচেয়ে সুন্দর ত্রিমাত্রিক বস্তু হলো গোলক। আর, সবচেয়ে সুন্দর দ্বিমাত্রিক বস্তু হলো বৃত্ত।তবে পীথাগোরীয়ান স্কুল এর বৃত্ত সম্পর্কিত কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ নেই।কনিক(কার্ভ),প্যারাবোলা(এপ্লিকেশন),হাইপারবোলা(গ্রিক 'হাইপারবোলি' শব্দের অর্থ এক্সিডিং),ইলিপস(ফলিং শর্ট) প্রভৃতি সম্পর্কে পীথাগোরিয়ানদের ধারণা ছিলো। 


রাজনৈতিক কারণে পীথাগোরিয়ান ভ্রাতৃত্ববোধ ভেঙে যায়, তবে পীথাগোরিয়ান স্কুল টিকে ছিলো প্রায় দুই শতাব্দীর বেশি সময়। পীথাগোরিয়ানদের মধ্যে ফিলোলাস এবং অ্যাকিটাস এর নাম উল্লেখযোগ্য। ফিলোলাস পীথাগোরিয়ান ডকট্রিনের উপর একটি বই লিখেছিলেন। তার মাধ্যমেই পীথাগোরিয়ান দর্শন সম্পর্কে সবাই জানতে পারে। অ্যাকিটাস (খ্রীস্টপূর্ব ৪২৮-৩৪৭) প্লেটোর সময় পর্যন্ত বেচে ছিলেন। তিনি 'ডেলিয়ান প্রব্লেম** ' এর একটি গাণিতিক সমাধান দিয়েছিলেন। 


** ডেলিয়ান প্রব্লেম ( Duplation of the cube problem) :


এই সমস্যাটি দিয়েছিলেন, ডেলফীর ডেলোস। কথিত আছে, গ্রিসে মহামারী দেখা দিলে ডেল্ফির মন্দিরের পুরোহিতরা দেবতার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। দেবতা তখন তাদেরকে বলেন, মন্দিরটিকে নতুন করে বানাতে হবে। এবং এর আয়তন হতে হবে পূর্বের দ্বিগুণ। তাহলে মহামারী ভালো হয়ে যাবে। 


মন্দিরটি ছিলো কিউব আকৃতির(ধরি, আয়তন 1) । মন্দিরের আয়তন দ্বিগুণ করতে গিয়ে তারা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ,উচ্চতা দ্বিগুণ করে ফেলে। ফলে মন্দিরের আয়তন হয়ে যায় আটগুণ(8)। মন্দির নতুন করে বানানোর পরেও তাই মহামারী ভালো হয়নি। 


প্লেটো এই সমস্যাটি সমাধান করার জন্য ইউডোক্রাস,মেনেক্সাস এবং অ্যাকিটাসকে অনুরোধ করেন। অ্যাকিটাস দ্বিঅনুপাত(এটি তার অবদান) ব্যবহার করে সমস্যাটির সমাধান করেন। কিন্তু, শুধুমাত্র জ্যামিতি(স্কেল, কম্পাস) ব্যবহার করে তিনি সমস্যাটির সমাধান করতে পারেননি বলে এটি প্লেটোর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। পরবর্তীতে হিপোক্রেটিস চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দেখান যে, ধারগুলো ৩√২ মাপের হতে হবে। ১৮৩৭ সালে পিয়েরে ওয়ানজেল, প্রমাণ করেন,শুধুমাত্র জ্যামিতি ব্যবহার করে (স্কেল, কম্পাস) ৩√২ (cube root two) আকারের 'কিউব' আকা সম্ভব নয়।( 3√2 is a not a constructible number.)

Comments

Popular posts from this blog

শুন্য কিভাবে এলো

 অন্য সব সংখ্যার মতোই শুন্য এর উৎপত্তি কবে থেকে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শুন্য ছাড়া এই উপমহাদেশের (hindu numerals) সংখ্যা পদ্ধতির সাথে অন্য সংখ্যা পদ্ধতির পার্থক্য সামান্য। অন্য সংখ্যার সাথে শুন্য এর প্রধান পার্থক্য এর স্থানিক মানে। ভারতীয় উপমহাদেশে শুন্য এর সবচেয়ে প্রাচীন এবং নির্ভরযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় ৮৭৬ সালের এক শিলালিপিতে। গোয়ালিয়রে প্রাপ্ত এই শিলালিপিতে ৫০ এবং ২৭০ সংখ্যা দুটি লিখা ছিল শুন্য ব্যবহার করে। তবে শুন্য এর ইতিহাস আরও প্রাচীন। ব্যাবিলনীয়রা সংখ্যার অনুপস্থিতি নির্দেশ করার জন্য আলাদা চিহ্ন ব্যবহার করত। তবে বর্তমানে আমরা যে কাজে শুন্য ব্যাবহার করে থাকি, ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতিতে তার কোনো ব্যবহার ছিলো না। গ্রিক পান্ডুলিপিতে স্থানিক মানের কিছু ব্যবহার দেখা যায়। ডিওফ্যান্টাস এর কাজে স্থানিক মানের প্রমান মিলে।  গ্রিকরা ওমিক্রন (O) চিহ্ন দ্বারা গর্ত নির্দেশ করতো। ব্রাক্ষ্মি লিপিতে শিং বিশিষ্ট একধরনের বৃত্তের(ছবি দ্রষ্টব্য) ব্যবহার দেখা যায়। যা ১০ নির্দেশ করতো। এই উপমহাদেশে ব্যবহৃত শুন্যের (০) সাথে আরবরা ৫ লেখার জন্য যে চিহ্ন ব্যাবহার করতো তার মিল ছিল। ...

কার্ল ফ্রিডরিখ গাউস

 ল্যাপ্লাসকে যখন প্রশ্ন করা হতো জার্মানির সেরা গণিতবিদ কে ? , তার একটাই উত্তর ছিলো, ফ্যাফ(pfaff)। গাউস কে বাদ দিয়ে ফ্যাফ এর নাম শুনতে হবে এটা কোনো প্রশ্নকর্তা ই আশা করতেন না।  তারা যখন তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতেন, তাহলে গাউস কী ?  ল্যাপ্লাসের উত্তর ছিলো, আরে ও তো ইউরোপের সেরা।   মর্ডান অ্যানালাইসিস এ সেরা তিনজনের ( ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,গাউস) একজন হলেন গাউস । গাউস ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট । তবে, গাউস এর কাজের মাধ্যমেই গণিতের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল ।  নতুন আবিস্কারের নেশা এবং সক্ষমতায় তিনি তার পূর্ববর্তী গণিতবিদদেরকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রমাণ এবং যথাযথ উপস্থাপনে একমাত্র গ্রিকদের সাথেই কেবল তার তুলনা চলে ।  মাত্র বিশ বছর বয়সেই উচ্চতর গণিতের পুরানো সব তত্ত্বকে  নতুন করে ব্যাখ্যা করেন এবং নতুন প্রমাণ পদ্ধতির মাধ্যমে সেগুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।  উপস্থাপনের সাবলীলতায় তিনি ল্যাপ্লাস এবং ল্যাগ্রাঞ্জকে ও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম ইনফিনিট সিরিজ(পূর্ণাঙ্গরুপে), ইলিপটিক ফাংশন এর ডাবল পিরিওডিসিটি,লিস্ট স্কয়ার মেথড, ডিটারমিনেন্ট এর সিস্টেমেটিক ব্যবহার...

লিওনার্দ অয়লার

 রাজা চতুর্দশ লুই এর সময় পার করে ইউরোপের গণিতের পতাকা এখন ফরাসিদের হাতে।  অন্যদিকে নিউটন আর লিবনিজ এর মৃত্যুর পরে ব্রিটেন আর জার্মানিতে গণিতের প্রদিপ নিভু নিভু করছে।   ১৭৩০ - ১৮২০ এই নব্বই বছর সময় হলো ফরাসি এবং সুইস গণিতের স্বর্ণযুগ যুগ।  এই সময় ফ্রান্সের ছিলো ল্যাগ্রাঞ্জ, ল্যাপ্লাস,লিজেন্ডার, মনগে। আর সুইজারল্যান্ডের ছিলো অয়লার।   বের্নুলি পরিবারের কারণে বাসেল এর নাম তখন গণিতবিদদের মুখে মুখে।  অন্যদিকে অয়লার এর কারণে তার সম্মান দ্বিগুণ হয়েছে।   অয়লার এর পিতা ছিলেন একজন যাজক।  তিনি জ্যাক বের্নুলির কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।  মুলত, পিতার আগ্রহেই অয়লারের গণিতের জগতে প্রবেশ। ইউনিভার্সিটি অব বাসেলে পড়ার সময় জন বের্নুলি ছিলেন অয়লার এর শিক্ষক।   মাত্র উনিশ বছর বয়সে জাহাজের মাস্তল নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমির কাছ থেকে পুরস্কৃত হন।  ১৭২৭ সালে জন বের্নুলির দুই ছেলে ড্যানিয়েল এবং নিকোলাস বের্নুলি  অনুরোধে  রাশিয়ার রানি ক্যাথরিন  অয়লারকে সেন্ট পিটার্সবার্গে আমন্ত্রণ জানান।  ১৭৩৫ স...